তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দুটি টার্মিনালের একটি রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এতে রাজধানী ঢাকাসহ তিতাস অধিভুক্ত (বিতরণ কোম্পানি) বেশ কয়েকটি জেলায় তীব্রভাবে গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে রাজধানীর শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক থেকে আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। এ পরিস্থিতি আজ মধ্যরাত পর্যন্ত থাকবে বলে জানা গেছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এলএনজির একটি টার্মিনাল সাময়িক বন্ধ রয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। যে কারণে তিতাসের বিতরণ লাইনে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। পিক আওয়ারে অনেক এলাকায় গ্যাসের চুলা জ্বালাতে সমস্যা হচ্ছে। এ পরিস্থিতির কারণে তিতাসের আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পসহ সব শ্রেণীর গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের স্বল্পচাপ আজ রাত ১২টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের কারণে একটি টার্মিনাল দিয়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আগামীকাল (আজ) টার্মিনালটি চালু হবে। তবে গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ ঠিক হতে রাত ১২টা নাগাদ লেগে যাবে। এরপর পরিস্থিতি পুনরায় স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহের এ পরিস্থিতির কারণে দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে, এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ হলে সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। সাময়িক এ সমস্যার জন্য গ্রাহকদের কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছে তিতাস কর্তৃপক্ষ এবং সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৪ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে গ্যাসের চুলা না জ্বালানোর কথা জানান তারা। গতকাল বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং আবাসিকের বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা গ্যাসের চুলা জ্বালাতে না পারার কথা জানিয়েছেন।
রাজধানী শ্যামলী এলাকার বাসিন্দা ফসিহ উদ্দিন জানান, রান্না করার মতো বাসায় গত ২৪ ঘণ্টায় চুলা জ্বালানো যায়নি। হোটেল থেকে খাবার কিনে খাব সেই পরিস্থিতিও নেই। কারণ আশপাশের হোটেলগুলো তিতাসের পাইপলাইনের গ্যাস নিয়ে ব্যবসা করে। সেখানেও গ্যাস না থাকার কারণে হোটেল এক প্রকার বন্ধ। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী হওয়ায় রান্না নিয়ে তীব্র বিড়ম্বনার কথা জানিয়েছেন তারা।
গ্যাস সরবরাহ কমে শিল্প-কারখানাগুলোতেও সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকার অন্তত পাঁচটি শিল্প-কারখানার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের পিএসআই চাপ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তারা ৪-৫ পিএসআই গ্যাস পাচ্ছে। আবার কোনো কোনো কারখানায় গ্যাসের শূন্যচাপ বিভিন্ন সময় থাকার কথা জানা গেছে। কারখানায় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদনে ঘাটতি হচ্ছে। অনেক কারখানায় গ্যাস না পাওয়ার কারণে শ্রমিকরা পুরোদমে কাজ করতে পারছেন না।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ গাড়ির সারি দেখা গেছে। বিশেষ করে গ্যাসের চাপ না থাকায় গ্যাস নিতে বড় সময় ধরে লাইনে থাকতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশন এলাকায় ও রাস্তায় দীর্ঘ সিএনজিচালিত গাড়ির যানজট ও ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন গণপরিবহনের যাত্রীরা।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে সেখানে পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহ দিতে পারে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে সর্বোচ্চ তিন হাজার ঘনফুট। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, ১৪ ফেব্রুয়ারি গ্রিডে ১ হাজার ৯৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়েছে। এতে একটি এলএনজি টার্মিনাল দিয়ে সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়েছে। তবে দুটি টার্মিনাল চালু থাকলে গ্রিডে গড়ে সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া যায়।
দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এগুলোর গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দুটি টার্মিনালের একটি পরিচালনা করে সামিট গ্রুপ এবং অন্যটির দায়িত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি।